রুদ্র ম আল-আমিন এর ছোটগল্প
” বিভাজন ”

রমিজের বয়স আঠারো, তিনি নিমতলা গ্রামের সোনাই এর একমাত্র পুত্র।বিবাহযোগ্য ছেলেটির জন্য তাঁর মা লাইলী প্রায় প্রতিদিনই রমিজের বাবার সহিত ঝগড়াঝাটি করিয়া থাকেন।
ইহা যেন সোনাই এর কাছে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপর হয়ে দাড়িয়েছে। রমিজ প্রায়শই রাত গভিরে বাপমায়ের ঝগড়াঝাঁটি শুনতে পায়। কিন্ত কখুনোই তাহা মনোযোগী হয়ে শুনতে চায় না।
মায়ের সহিত রমিজ খুব কম কথা বলে। কারন, তার মা একটু উগ্রস্বভাবী।
রোজই ঝগড়া শুনতে শুনতে রমিজেরও এখুন অভ্যাস হয়ে গেছে।
আর তাহার বাবা সোনাই ক্লান্ত শরীরে নিরভে নিভৃতে তাহা সইতে থাকেন।
সোনাইর অভাবী সংসার অদ্যাবধি কখুনো আলোর মুখ দেখেনি। খুব ছোট্টবেলার পিতৃবিয়োগ ঘটে।
হালচাষ করার মত ছিল না তাহার বাবার একখন্ড জমিও। দিনের পর দিন, না খেয়ে দিনাতীপাত করতে থাকে এই ছেলেটি।
অবশেষে ঠাই হয় সিরাজ মাতব্বরেরর বাড়িতে, রাখালের কাজ করার জন্য।
বেশ কয় বছর কেটে যায় ওখানেই।এরপর মাতব্বর এর মেয়ে লাইলীর প্রেমে পরে যায় সোনাই। বাপ মা মরা সোনাইর সাথে বিয়ে দিতেও রাজী হয় মাতব্বর।
সিরাজ মাতবরের চার মেয়ের মধ্যে, তৃতীয় সন্তান লাইলী।
এর পর যথারীতি নিয়ম মেনে, বিবাহ সম্পন্ন করেন সোনাই ও লাইলীর ।
পণ হিসেবে বিয়ের পর কুড়ি শতক যায়গা লিখে দেন সোনাইর নামে। এবং গ্রামের সর্ব দক্ষিনে ঐ সম্পত্তির উপর একটা কুঁড়ে ঘর বানিয়ে দেন।
কুড়ি বছর আগের সেইসব স্মৃতি সোনাই প্রতিদিন রাতে, ঘুমের ঘোরে চোখবন্ধ করলেই স্পষ্ট দেখতে পান।
সোনাই সারাদিন পাটনীর কাজ করে। যদিও এটা কোন কাজের মধ্যে পরে না। কারন ওটা বছরের ছয়মাস চলে। আর বাকী ছয়মাস ঘুরে ফিরেই দিনকাটে।
উত্তর পাড়ার রহিমুদ্দির মেয়ে ময়নার সহিত আজকাল রমিজের খুব সখ্যতা দেখা যায়। পাড়ার লোকজন এই বিষয়টি নিয়ে উচ্চবাচ্য

করতে দেখা যায়নি।
কিন্ত ব্যাপারটি সোনাইর কানে অবধি আসলেও মনে মনে চেপে গেছে।
সেদিন শুক্রবার নদীর ওপারে দেওয়ানতল হাট থেকে রমিজ ফিরছিল। মাথায় তাহার ঝাকা খুব জোরে জোরে হাটতেছিল। রমিজের বন্ধু মতি দুর থেকে দেখেই রমিজকে ডাকতে লাগল। কিন্ত বেশ কয়েকবার রমিজ রমিজ বলে ডাকলেও রমিজ তাহা শুনতে পায়নি। অবশেষে মতি দৌড়াতে দৌড়াতে রমিজের খুব নিবটে পৌছে গিয়ে বলল
ঃ দোস্ত হাট থেইন কি কি কিনলি রে?
ঃ মতি নাহি রে
ঃ হ রে দোস্ত তোরে অনেক ডাকলম শুনলি না তাই দোড়াইয়া আসলাম।
ঃ ময়না কিছু কইছে?
ঃবিড়ি খাইতে পাঁচটা ট্যাহা দিছে,
ঃ তুই নিলি,,,,
ঃ ফিরাইয়া দিমু
ঃনা—-
ঃতাইলে ধর
ঃ মাঝায় গুইজা দে, মাথায় চাইল ডাইল আছে।
ঃ রমিজ আরো একখান কথা কইছে,,, কমু,,
ঃ ক দেহি
ঃ ময়না তগো বাইতে যাইতে চায়।
রমিজ একটু অন্য মনস্ক হইয়া গেল। রমিজ কি বলবে ভেবে পাচ্ছিল না। মাথার ঝাকাটা মতিকে দিয়ে মাটিতে নামাল।সরুরাস্তায় ঝাকা নামিয়ে মতিকে বলল যে ঃ দাড়া,, মুইতা নই।
এর পর আবার মতিকে দিয়ে ঝাকাটা মাথায় তুলে নিল। এবং মতিকে বলল ঃ এবার তুই বাইত যা, কাইল কথা কমুনে,,
মতি ওর বাড়ির দিকে চলিয়া গেল,

সন্ধের ঠিক কিছুকাল আগে রমিজ বাড়ি ফিরল।
রাতে খাবার খেতে গেলে রমিজের মা, রমিজকে ময়নার কথা জিগ্যেস করল।
কিন্ত রমিজ, ময়নাকে পছন্দ করে, একথা শোনার পর
তাহার মা আর তেমন কিছুই বলিল না। রাত গভীর হইলে সেনাই বাড়ি ফেরে। কারন, ঘাটে পারাপার বন্ধ হইলে তবেই নৌকা বাধাই করতে হয় এবং তারপর তার বাড়ি ফেরা। প্রতিদিনকার ন্যায় আজো সোনাই গভীর রাতে বাড়ি ফিরল।

রমিজ ঘুমিয়ে পড়েছিল, হঠাৎ বাবা মায়ের ঝগড়াঝাঁটিতে তাহার ঘুম ভেংগে যায়।
রমিজের বাবা সোনাই সম্ভত বিয়েতে রাজী নয়। ইহা বলতেই রমিজের মা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছে। রমিজ কাচারীঘর হতে বেশ মনোযোগী হয়েই শুনতে ছিল। হঠাৎ তাঁর মা রেগে গিয়ে বলে উঠল,,
ঃএই বিয়া আমি করামু তুমি রাজী না অইলি রবিক দিয়া করামু। তুমি হুইনা রাইহো।

রমিজের বাবা এরপর চুপচাপ ঘর হতে বাহিরে বের হলেন। হঠাৎই সোনাই দেখল যে,
রমিজ জানালার দ্বারে বিড়ি খাইতেছে। হেরিকেনের আলোতে রমিজের মুখটা একনজর দেখতেই তাহার চোখে জল এসে গেল। সোনাই মুহুর্তে মুখটা ঘুরিয়ে নিলো কিন্ত একটা আর্তচিৎকারে যেন তাহার দম বন্ধ হবার উপক্রম হইল।

শেষরাত্রে সোনাই ঘরে ফিরলেও তাহার আর ঘুমানো হইল না। ফজরের আজান দিতেই তিনি আবার রওনা হইলেন ঘাটের দিকে।
রমিজের মা, পরদিন রহিমুদ্দির বাড়ি গিয়ে, বিয়ের দিন তারিখ পাকাপোক্ত করে আসলেন। কিন্ত রমিজের বাবার আর কোন মতামত রইল না। পরের সপ্তাহ শুক্রবার বিয়ের আয়োজন সম্পন্না হইল। রমিজের মা অর বাবার ঝগড়াঝাঁটি বলা চলে একেবারেই নির্মুল হয়ে গেল। কিন্ত সোনাইয়ের মুখের হাসি যেন চিরতরে বিদায় নিয়েছে। নাওয়া খাওয়া যেন একেবারে ছেড়েই দিয়েছে এই লোকটা। এর পর প্রতিক্ষার পালা শেষ। দেখতে দেখতে শুক্রবার এসে গেল। সকাল বেলা গ্রামোফোন বাজতে লাগল বাড়ির উঠোনে। পাড়ার লোকজন গ্রামোফোন এ গান শুনতে চলে এলো রমিজদের বাড়ি। ছোটছেলেপেলেদের হৈচৈ এ ভরে উঠল সোনাই এর বাড়ি।
কিন্ত সকাল থেকেই সোনাই লাপাত্তা ছিল। দুপুরবেলা কে একজন ধরে আনল নদীর ঘাট থেকে। হাসিখুসি সোনাইকে প্রায় পাগলের মত দেখতে মনে হল।
তার কিছুক্ষণ পরই বরযাত্রীসহ রওনা হল উত্তরপাড়া রহিমুদ্দির বাড়ি।
রহিমুদ্দি বাড়িতে মেয়ের বিয়ের জন্য, বেশ জমকালো আয়োজন করেছে। কারন সোনাই গরিব হলেও রহিমুদ্দির অবস্থা বেশ ভাল।
ওদিকে সোনাই এর বউ বাড়িতে, রমিজের বাসরঘর সাজানোর জন্য পাড়ার ছেলেদের বলে এসেছে।
রহিমুদ্দির বাড়িতে বরযাত্রীদের বেশ করে খাওয়ানো হচ্ছে। একটা হাসিখুসিতে যেন প্রানবন্ত হয়ে উঠেছে পুরো বাড়িটি। রহিমুদ্দিও সবদিকে খেয়াল রাখছেন যেন কারো খাতির যত্ন কম না হয়। রহিমুদ্দির পুরোনো বন্ধু রবিচাঁনও খেদমতে ব্যাস্ত।
কিস্ত সোনাই নিজে কিছুই খেল না।

সোনাই কে, রহিমুদ্দি খাওয়ার জন্য অনেক পীড়াপীড়ি করেও ব্যার্থ হল। শেষ মেষ জানতে চাইল কি সমস্যা।সোনাই শুধু এটুকু জানাল যে তার বুকে প্রচুর ব্যাথা করছে।
সোনাই এর জন্য কাচারী ঘরে শোবার ব্যাবস্থা করা হইল। এ্ং এর কিছুক্ষন পরই মৌলভী সাহেবকে ডাকা হইল বিয়ে পড়ানোর জন্য। উপস্থিত সকলের মাঝে
মৌলভী সাহেব রমিজকে জায়নামাজ এ বসিয়ে বললেন ঃ
তোমার নাম কি বাবা?
ঃ রমিজ মিয়া
ঃ বাবার নাম বলো,,,
রমিজ কোন কথা বলছে না। তখুন মৌলভী সাহেব আবার বললেন, ,, বাবার নাম বলতে হয় । এত আবার লজ্জা কিসে?
রমিজ খুব আস্তে করে বলল
ঃরবিচাঁন
রহিমুদ্দি জোরে একটা ধমকদিলেন এবং বলল যে,,
ঃ রবিচাঁন এই যে, তর বাপের নাম ক,,
যখন দ্বিতীয়বার রবিচাঁন বলল তখুন পুরো বাড়িতে একটা হৈচৈ পরে গেল। সোনাই বিছানা ছেড়ে গামছাটা গরায় জুলিয়ে চোখ মুছতে মুছেতে রওনা হইল বাড়ির দিকে। রবিচান এর পর ছেলে আর নতুন বউ নিয়ে চলল বাড়ির দিকে। পরেরদিন ভোর হইবার পূর্বেই জানা গেল সোনাই গলায় ফাঁস দিয়ে আত্বহুতি দিয়েছে। পাঠক,
পরকীয়া এমন এক ব্যাধি যা হঠাৎ করেই সবকিছু ভন্ডুল করে দিতে পারে, যে কারো সাজানো সংসারে, পরিশেষে বলব এই পাপ কর্ম থেকে সবাই সাবধানী হবেন।
(সমাপ্তি)

২৮/০৫/২০২০